বাদশা শাদ্দাদের এর জীবনী | শাদ্দাদের বেহেশতের কাহিনী। আদের দুই ছেলে- শাদীদ ও শাদ্দাদ। শাদীদ দীর্ঘ সাতশ’ বছর পর্যন্ত রাজত্ব করে মৃত্যু বরণ করে। শাদীদের মৃত্যুর পর তার ভাই অভিশপ্ত শাদ্দাদ বাদশাহ হয়। সমকালীন সমগ্র জগত তার শাসনাধীনে ছিল। তাকে হোদায়াতের উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা হযরত হুদ (আঃ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি শাদ্দাদকে বললেন, হে শাদ্দাদ! আল্লাহ তাআলা তোমাকে হাজার বছরের দীর্ঘ জীবন দান করেছেন। হাজার নগর-বন্দর তুমি লাভ করেছ। হাজার সুন্দরী ললনা পেয়েছ এবং হাম্পাস দেশ তুমি জয় করেছ। এখন আল্লাহর শোকর আদায় কর। তোমার প্রতি তাঁর কৃত দানের জন্য কৃতজ্ঞ হও। তাঁকেই এক একক অংশীবিহীন সত্তা বলে বিশ্বাস কর। আল্লাহ তাআলা তোমাকে আরও অসংখ্য অগণিত নে’মত দেবেন এবং কেয়ামতে এসব নে’মতের কোন হিসাব নেবেন না। বিনা হিসাবে নির্বিঘ্নে তুমি জান্নাতে চলে যাবে। হুদ (আঃ) মুক্তি লাভের এ ধরনের ভাল ভাল পথ তাকে বলেন। কিন্তু তার বধির কানে এসব ভাল কথা, উপদেশ লহরী কোন প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে নাই।
সে হুদ (আঃ)-এর উদ্দেশে বলল- তুমি আমাকে জান্নাতের লোভ দেখাচ্ছ! আমি জান্নতের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা শুনেছি। আমিও দুনিয়াতে জান্নাতের অনুরূপ এক জান্নাত বানাব এবং সেই জান্নাতে বাস করব। তোমার আল্লাহর জান্নাত দিয়ে আমার কোন কাজ নাই। কালবিলম্ব না করে অভিশপ্ত শাদ্দাদ তার শাসনাধীন এলাকাসমূহের শাসক, মন্ত্রী এবং তথাকার প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী লোকদের নিকট ফরমান পাঠাল- তোমরা এমন এক খণ্ড সমতল ভূমি ও প্রশস্ত ময়দান খুজে পেতে ঠিক কর যা জান্নাত বানানোর জন্য যথাযোগ্য। কথিত আছে, হাজার রাজ্য ও হাজার শহর তার শাসনাধীনে ছিল। প্রতিটি রাজ্যে ও শহরে লাখ লাখ পুরুষ বর্তমান ছিল। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত কথিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ভূমি খুজতে খুজতে অবশেষে আরবে চল্লিশ ফার্লং দৈর্ঘ্য-প্রস্থবিশিষ্ট এক খণ্ড ভূমি পাওয়া যায়। উদ্দিষ্ট ভূমি মেলার পর সে তিন হাজার ওস্তাগার, এক হাজার পুরুষ নির্মাণ কারিগর নির্বাচন করে এবং শাসনাধীন সমগ্র এলাকার সম্পদ ভাণ্ডার তথায় নিয়ে একত্র করার জন্য আমীর ওমরা ও শাসকদের প্রতি ফরমান জারি করে।
আরো পড়ুন: হযরত শীষ আঃ এর জীবনী ও মূর্তিপূজার ঘটনা
আরো পড়ুন: হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কাবা পুনঃ নির্মাণ | মুল কাহিনি জানুন
প্রথমে চল্লিশ গজ নীচে থেকে ভূমি খুঁড়ে মর্মর পাথর দিয়ে তার কল্পিত জান্নাতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা এই কল্পিত জান্নাতের দেয়াল উঠানো হয়। ছাদ এবং খাম্বাসমূহ। সবুজ রংয়ের যবরজদ ও যমররদ পাথর দিয়ে তৈরী হয়। আল্লাহ তাআলা অভিশপ্ত শাদ্দাদের কল্পিত জান্নাতের খাম্বাসমূহ ও অন্য অবস্থাদি সম্পর্কে কোরআনের মাধ্যমে পরবর্তী কালের ‘লোকদের অবহিত করেছেন। আর কেউ জগতে এমন ভূস্বর্গ বানাতে সক্ষম হয় নাই। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادُ الَّتِي لَمْ يُخْلَتْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ উচ্চারণ: আলাম তারা কাইফা ফাআলা রাব্বুকা বিআদিন ইরামা যাতিল ইমাদিল্লাতী লাম ইউখলাক মিসলুহা ফিলবিলাদ। অর্থ: আপনার রব আদের সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন তা কি আপনি দেখেন নাই? যে বিরাট খাম্বাসমূহের অধিপতি ছিল, সমগ্র জগতে সেটার মত আর কিছু নির্মিত হয় নাই। ইরাম আদ জাতিরই একটি গোত্রের নাম। তাদের রাজত্ব ছিল। তারা বড় বড় ইমারতরাজি নির্মাণ করত। সেসব ইমারতের জান্নাতসম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তারা তাতে অর্ধেক স্বর্ণ আর অর্ধেক রৌপ্যের গাছ বানিয়ে সবুজ যমররদের পাতা সেসব গাছে লাগাত। এসব গাছের ডালপালাসমূহ ছিল লাল ইয়াকুত পাথরের। রকমারি ফলফলারি এসব গাছে লাগানো হয়েছিল।
শাদ্দাদের কল্পিত জান্নাতের মেঝে মাটির পরিবর্তে মেশক, আম্বর ও জাফরান দ্বারা ভরে দেওয়া হয়। এর প্রাঙ্গণে নুড়ি পাথরের পরিবর্তে মতি ও অন্যান্য দামী পাথর বিছিয়ে দেওয়া হয়। এতে দুধ, মদ্য ও মধুর নহর প্রবাহিত করা হয়। সে তার এই কল্পিত ভূস্বর্গের দরজায় চার চারটি বিস্তৃত মাঠ তৈরী করে। সে মাঠে ফলফলারির গাছ লাগানো হয়। প্রতিটি মাঠে স্বর্ণ-রৌপ্যের নির্মিত লাখ লাখ কুরসী পাতা ছিল। প্রতি কুরসীতে হাজার দস্তরখান এবং প্রতি দস্তরখানে রকমারি নে’মত রাখা ছিল। কথিত আছে, এই কল্পিত ভূস্বর্গের নির্মাণ ব্যয় নির্বাহার্থ প্রতিদিন স্বর্ণ-রৌপ্যের চল্লিশ হাজার ভাণ্ডার প্রেরিত হত। এভাবে তিনশ’ বছরে কল্পিত ভূস্বর্গের কাজ সমাপ্ত হয়। ভূস্বর্গ নির্মিত হলে কার্যনির্বাহীদেরকে সর্বত্র এ নির্দেশ সহকারে পাঠানো হয় যে, এক দেরহাম পরিমাণ রৌপ্যও কোথাও পাওয়া গেলে তা হাতছাড়া করবে না। তা এনে ভূস্বর্গে দাখিল করবে। ঘটনা এত দূর পর্যন্ত গড়ায় যে, এক নিঃস্ব গরীব মেয়েলোকের মেয়ের গলায় এক দেরহাম রৌপ্যের একছড়া গলবন্ধ ছিল। শাদ্দাদের জালেম অত্যাচারী কার্যনির্বাহীরা এও হাতছাড়া হতে দেয় নাই। তারা এ গলবন্ধ মেয়েটির থেকে ছিনিয়ে নেয়। মেয়েটি কান্নাকাটি করে মাথা কুটে বলছিল- আমি নিঃস্ব গরীব মেয়ে। এই এক দেরহাম রৌপ্য ব্যতীত আমার আর কিছুই নাই। তোমরা এই এক দেরহাম রৌপ্য আমাকে দান করে দাও। কিন্তু শাদ্দাদ শাহীর জালেমরা কিছুতেই কর্ণপাত করে নাই। তখন গরীব নিঃস্ব মেয়েটি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাল- ইয়া এলাহী! তুমি এই জুলুমের যথার্থ ন্যায়বিচার কর। এই জালেমের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মজলুমকে রক্ষা কর। তার অবিচার অন্যায়ের তুমিই ইনসাফ কর- এ জালেমকে দমন কর। মেয়েটির আহাজারি আর ফরিয়াদ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। তা যেন এ কথারই উদাহরণ- মজলুমের বদ দোআ হতে আত্মরক্ষা করে চল, কেননা মজলুমের বদ দোআ কবুল হয়েই থাকে। কথিত আছে, অভিশপ্ত শাদ্দাদ তার শাসনাধীন সমগ্র এলাকায় আতিপাতি করে খুজে সন্দর সুন্দর বালক বালিকা তার দামেশকের প্রাসাদে একত্র করে। তার উদ্দেশ্য ছিল, এসব বালক-বালিকাকে কল্পিত ভূস্বর্গে হুর ও গেলমানের মত সেবাকার্যে নিয়োজিত রাখবে। দশ
বছরকাল পর্যন্ত অভিশপ্ত এই কাফের স্বকল্পিত ভূস্বর্গ দর্শনের কামনা-বাসনা পোষণ করতে থাকে। তার এ কল্পিত ভূস্বর্গে সে প্রবেশ করুক এটা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল না। একদিন সে পরিপূর্ণ আগ্রহ সহকারে দুইশ’ গোলাম সাথে করে তার ভূস্বর্গ দর্শনে গমন করে। ভূস্বর্গের নিকট উপনীত হয়ে গোলামদের সবাইকে চতুর্দিকের মাঠে পাঠিয়ে দিয়ে একটি মাত্র গোলামকে সঙ্গে করে ভূস্বর্গের দরজায় পৌঁছে। তথায় সে এক লোককে দাঁড়ানো দেখতে পায়। শাদ্দাদ তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে? দাঁড়ানো লোকটি বলল, আমি মালাকুল মউত আযরাঈল। শাদ্দাদ আবার জিজ্ঞাসা করল, তুমি এখানে কেন এসেছ? মালাকুল মউত বললেন, তোমার জীবন হরণের জন্য। শাদ্দাদ বলল, তুমি আমাকে কিছু সময়ের অবকাশ দাও, যেন আমি আমার নির্মিত ভূস্বর্গ দেখতে পারি। মালাকুল মউত বললেন, তুমি তোমার স্বকপোলকল্পিত ভূস্বর্গে যাও এটা আল্লাহর ইচ্ছা নয়। তুমি স্বর্গে কি যাবে! তোমার যাওয়ার জায়গা তো হচ্ছে নরক! শাদ্দাদ বলল, আমাকে ছাড় আমি ঘোড়ার পৃষ্ঠ হতে নীচে অবতরণ করি। আযারাঈল (আঃ) বললেন, না, এটাও আল্লাহর ইচ্ছা নয়। এ সময় তার এক পা ঘোড়ার পাদানীতে আর এক পা তার কল্পিত ভূস্বর্গে।
এ অবস্থায়ই আযরাঈল (আঃ) তার জীবন হরণ করেন। অভিশপ্ত শাদ্দাদ ভূস্বর্গ না দেখার মনোব্যথা নিয়েই জাহান্নামবাসী হয়। এরপর আসমান থেকে এক ফেরেশতা এমন ভয়ংকর হুংকার ছাড়লেন যে, তার সঙ্গী সাথীদের সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এক গ্রাস খাদ্য মুখে উঠাবার সময়ও এ অভিশপ্ত দুর্ভাগা পায় নাই। সে সময় না তার সম্পদ ছিল আর না রাজত্ব। তার সমগ্র রাজ রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যায় এবং তার সঙ্গী সাথী অনুসারী অধীনস্থ ও শাসিতদের সকলেই জাহান্নাম ‘বাসী হয়। তার কল্পিত ভূস্বর্গ জমিনে ধূসিয়ে দেওয়া হয়। তার কল্পিত ভূস্বর্গের কোন নির্দশন আর অবশিষ্ট থাকে নাই। শাদ্দাদের ধ্বংসের পর আল্লাহ তাআলা হযরত সালেহ (আঃ)-কে সামুদ জাতির প্রতি নবী করে পাঠান।
Discover more from Info Guru BD
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
Info Guru BD Education is the key to unlocking the world






